শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা, বাঙালির ত্মকের যত্ন নিতে সদা হাজির বোরোলিন৷ কিন্তু জানেন কি, এই বোরোলিনের পিছনের গল্প?

নিজস্ব প্রতিবেদন: সবমিলিয়ে আর হয়তো মাসখানেকের অপেক্ষা। তারপরেই কিন্তু রাজ্যে শীতের আমেজ শুরু হয়ে যাবে। মোটামুটি কালীপুজো শেষ হতে না হতেই উত্তুরে হওয়ার আগমন শুরু হয়ে যায়। শীতকাল মানেই নানান ধরনের কোল্ড ক্রিম আর বিভিন্ন ত্বকের রুক্ষতা দূরকারী জিনিসের সমাহার। আজকাল কিন্তু ত্বকের যত্নের জন্য বহু ক্রিম বেরিয়ে গিয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় ধরেই যেটা আমাদের সকলের মধ্যে চলে আসছে সেটা হল বোরোলিন।

তবে আপনারা কি জানেন এই বোরোলিন কে কেন্দ্রীভূত করে রয়েছে একটি আকর্ষণীয় গল্প? কাহিনী হয়তো অনেকেরই অজানা।’অ্যারোমেটিক অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বোরোলিন …’ গত শতাব্দীর এই জিংলটি কে ভুলতে পারে । এমন একটি ক্রিম যা শুধুমাত্র বিউটি প্রোডাক্ট হিসেবে পরিচিত নয় বরং প্রায়ই প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্সে যার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যেত। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা বোরোলিনের কিছু অজানা গল্প জেনে নেব।

স্বদেশী আন্দোলন চলাকালীন ব্রিটিশদের পণ্যের সঙ্গে লড়াই করার জন্য বাজারে বোরোলিন নিয়ে আসা হয়েছিল। আজ প্রায় ৯২ বছর ধরে কিন্তু বহু মানুষের বাড়িতে এটি নিজের জায়গা দখল করে রেখেছে। ত্বকের যত্ন থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাটা ছেড়া সমস্ত কিছুতেই কিন্তু মানুষ বোরোলিন ব্যবহার করে থাকেন। এই বোরোলিনের আত্মপ্রকাশ এর পেছনে ছিলেন একজন বাঙালি। তিনি হলেন গৌর মোহন দত্ত।

স্বদেশী আন্দোলন চলাকালীন,1929 সালে , গৌর মোহন দত্ত মানুষের জন্য একটি ভারতীয় অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম তৈরির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যা মানুষের মধ্যে নিমেষেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ শাসনকালে সেই সময় কিন্তু শুধুমাত্র বিভিন্ন দামি ক্রিম বাজারে বিক্রি করা হতো। তবে বোরোলিন আসার পরে এর কম দামের কারণে হোক কিংবা স্বদেশী আন্দোলনের প্রভাবের কারণে, অচিরেই কিন্তু এটা সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।

  • গৌর মোহন দত্তের পরিচয়:

বোরোলিনের জন্মের পেছনে যে মানুষটি অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন সেই গৌর মোহন দত্ত ছিলেন আদপে বিদেশি পণ্যের বিক্রেতা তথা আমদানিকারক। ভারতে স্বদেশী আন্দোলনের রেশ চলাকালীন সময়ে তিনি সেই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। সেই সময়ে গৌর মোহন দত্ত বুঝতে পারেন,ভারতকে সাহায্য করার সর্বোত্তম উপায় হল – এটিকে আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা । তাই তারা এমন পণ্য তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যা মানসম্মত বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে। তবে সেই সময়কার ব্রিটিশ শাসিত ভারতে দাঁড়িয়ে এই ব্যাপারটি কিন্তু একেবারেই সহজ পর্যায়ে ছিল না।

প্রচুর পরিমাণে বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও নিজের লক্ষ্যে কাজ করে চলেছিলেন গৌর মোহন। বহু চেষ্টার পর নিজের বাড়িতেই বিদেশি পণ্যের সঙ্গে লড়াই চালানোর জন্য বোরোলিন তৈরি করতে সক্ষম হন এই মানুষটি। ১৯২৯ সালে অন্যান্য বিভিন্ন জিনিসের সাথে বোরোলিন বাজারে নিয়ে আসেন গৌর মোহন দত্ত। প্রথম সময়ে সবুজ টিউবে এটি বাজারে এসেছিল।বোরোলিনের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটির নাম জিডি ফার্মাসিউটিক্যালস । জিডি ফার্মাসিউটিক্যালস পরিচিত জনগণের বোরোলিন নামেও।

  • বোরোলিন শব্দের অর্থ:

স্বদেশী আন্দোলনের সময় থেকে প্রচলিত এই বোরোলিন নামের পেছনে রয়েছে একটি গূঢ় অর্থ।বোরোলিন শব্দের প্রথম অংশটি হল বোরো, যা বোরিক পাউডার থেকে উদ্ভূত যার একটি অ্যান্টি-সেপটিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে । দ্বিতীয় অংশ হল ওলিন … এই শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ওলিয়ন ( oleon ) থেকে , যার অর্থ তেল। আজকালকার দিনে কিন্তু সাধারণত বেশিরভাগ কোম্পানি তাদের তৈরি ক্রিমের ফর্মুলা গোপন রেখে থাকে। তবে বোরোলিনের ফর্মুলা কিন্তু কখনোই গোপনে রাখা হয়নি।বোরোলিন অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম অ্যান্টিসেপটিক বোরিক অ্যাসিড , অ্যাস্ট্রিনজেন্ট এবং সানস্ক্রিন জিংক অক্সাইড এবং ইমোলিয়েন্ট ল্যানোলিন ব্যবহার করে।

  • বোরোলিন ক্রিমের ব্যবহার ও অন্যান্য কথা:

ঠোঁট ফেটে যাওয়া থেকে শুরু করে ত্বকের যত্ন, ছোটখাটো আঘাত, কাটা ছেঁড়ায় অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে এই বোরোলিন কাজে লেগে থাকে। যে কোন ঋতুতেই কিন্তু মানুষ এই ক্রিমটি সমানভাবে ব্যবহার করে থাকেন। শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক সকলের জন্যই এই ক্রিমটি ব্যবহার করা যেতে পারে। সবথেকে বড় ব্যাপার মহিলা পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্যই এই ক্রিম তৈরি করা হয়েছিল।

তৎকালীন ভারতে বড় কোন বিজ্ঞাপনের সুযোগ না থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যেই জনগণের মধ্যে এই ক্রিম গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে।স্বাধীনতা-পূর্ব ভারতে , কাশ্মীরিরা হিমশীতল এবং শুষ্ক ত্বক থেকে মুক্তি পেতে এটি ব্যবহার করত এবং দক্ষিণ ভারতের লোকেরা তাপ থেকে বাঁচতে এটি ব্যবহার করত। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ক্রিম এর ব্যাপকতা তৎকালীন বিভিন্ন আর্টিকেলের মাধ্যমে কিন্তু আমরা জানতে পারি।

সত্যি কথা বলতে গেলে সেই সময় ভারতের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল এই ক্রিমটি। এই ক্রিম কে কেন্দ্র করে এমন অনেক উপাখ্যান রয়েছে যা হয়তো অনেক মানুষকেই অবাক করতে বাধ্য করবে। কথিত আছে যে বোরোলিনের জনপ্রিয়তার খবর পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু এবং অভিনেতা রাজকুমারের কাছে এলে তাঁরাও এটি ব্যবহার করতে শুরু করেন। পাশাপাশি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে বোরোলিন।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় , যুদ্ধের কারণে যে অভাব সৃষ্টি হয়েছিল ,সেই সময়ে প্রচলিত প্যাকেজিং না করে তখন বোরোলিন উপলব্ধ পাত্রে প্যাকেজ করা হয়েছিল।

1947 সালের 15 আগস্ট ভারত যেদিন দেশ স্বাধীন হয় , সেদিন জিডি ফার্মাসিউটিক্যালস এই আনন্দ উপলক্ষ্যে সাধারণ জনগণের জন্য বিনামূল্যে 1,00,000 বোরোলিন টিউব বিতরণ করেছিল । 1947, সালের 15 অগস্ট কলকাতার দুটি সংবাদপত্রে এ বিষয়ে একটি বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়েছিল।এরপর বহু বছর ধরে কোম্পানিটি শুধুমাত্র একটি পণ্য ‘ বোরোলিন ‘ নিয়েই রয়ে গিয়েছিল। জিডি ফার্মা 90 এর দশকের শেষ দিকে ‘ এলেন হেয়ার অয়েল ‘ বাজারে নিয়ে আসে।2003 সালে, কোম্পানি ‘ সুথল ’ নামে একটি অ্যান্টিসেপটিক তরল নিয়ে আসে। তবে অন্যান্য পণ্যগুলির তুলনায় সুথল আর বোরোলিন কিন্তু সব থেকে বেশি জনপ্রিয়তা পায় সাধারণ মানুষের মধ্যে।

Back to top button