ত্বকের যত্ন নিতে ব্যবহার করুন বরফ, জেনে নিন রূপচর্চায় এই বরফ ব্যাবহারের ১২টি কার্যকরী উপায়!

নিজস্ব প্রতিবেদন :- রূপচর্চার কাজে বরফ ব্যবহার করা হয়ে থাকে তা আমরা দীর্ঘদিন ধরেই জানি। তবে আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা বরফের এমন কিছু ব্যবহার সম্পর্কে আপনাদের সাথে আলোচনা করব যা রীতিমতো আপনাদেরকে অবাক করতে বাধ্য করবে। আজকের এই প্রতিবেদনটি যদি আপনারা মনোযোগ সহকারে পড়েন তাহলে বরফের প্রতি যে আপনাদের আলাদা ভালোবাসা তৈরি হবে এ কথা আমরা স্পষ্ট বলতে পারি। বরফের ফেস প্যাক বা আইস কিউব ফেস প্যাক ত্বকের যত্ন নিতে দারুন কাজ করে।

বরফ ব্লাড সার্কুলেশন ঠিক রাখতে সাহায্য করে, যার ফলে আমাদের স্কিন বা ত্বক স্বাভাবিক জেল্লা বজায় রাখে। অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে মুখে বরফ লাগানো উচিত কি উচিত নয়? অবশ্যই ত্বকের জন্য বরফ কিন্তু খুবই ভালো একটি জিনিস। সব থেকে বড় কথা বরফের কোন রকমের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া কিন্তু নেই। যদি আপনাদের ত্বকে বরফ কাজ না ও করে সে ক্ষেত্রে কিন্তু এটি কোন ক্ষতিও করবে না। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা বরফের তৈরি বেশ কয়েকটি ফেসপ্যাক নিয়ে আলোচনা করতে চলেছি । তবে তার আগে আমাদের জেনে নিতে হবে বরফের উপকারিতা কি কি এবং কিভাবে ত্বকে বরফ ব্যবহার করা যেতে পারে।

  • বরফ ব্যবহার করার উপকারিতা:

১) বরফ আমাদের ত্বকে রক্ত সঞ্চালনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় যার ফলে আমাদের ত্বক কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে সতেজ থাকে।

২) স্কিনের উপরের মরা কোষ দূর করে। বন্ধ থাকা পোর্স খুলে দেয় ফলে স্কিনের ডালনেস দূর হয়।

৩) ব্রণ বা গরম ফোঁড়া হতে দেয় না। হলে তা দ্রুত দূর করে।

৪) মেকাপের আগে বরফ মুখে ঘষে নিলে বা বরফের ফেস প্যাক ব্যবহার করলে মেকাপের বেস খুব ভালো ভাবে মুখে বসে। এছাড়াও বরফ ব্যবহার করে ত্বকের অনেক রকম যত্ন কিন্তু আপনারা নিতে পারেন।

তবে এই বরফ ত্বকে লাগানোর কিন্তু কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। যদি বরফ বা আইস কিউবের প্যাক আপনারা সঠিক ভাবে লাগাতে পারেন তবেই কিন্তু তা কার্যকরী হবে। চলুন জেনে নেওয়া যাক কিভাবে এই প্যাক আপনারা ব্যবহার করবেন সেই বিষয়ে।

  • সরাসরি কখনো বরফ বা আইস কিউব কিন্তু মুখে ব্যবহার করা উচিত নয় একেবারেই।
  • বরফের সাথে যদি কোন সামগ্রী মিশিয়ে থাকেন সেক্ষেত্রে কিন্তু চোখের থেকে যতটা সম্ভব এটি তুলে রাখতে চেষ্টা করবেন।
  • বরফ যেখানেই লাগান না কেন এক ঘন্টার বেশি কিন্তু তা ব্যবহার করবেন না এবং অবশ্যই একটি পাতলা সুতির কাপড়ের মুড়িয়ে ত্বকে লাগানোর চেষ্টা করবেন।
  • এবার আমরা জেনে নেব বরফের তৈরি বারোটি ফেসপ্যাক সম্পর্কে:

১) গ্রিন টি আইস ফেসপ্যাক:

এই ফেসপ্যাক অ্যান্টি অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং আমাদের ত্বককে উজ্জ্বল রাখতে অত্যন্ত সাহায্য করে থাকে। এই প্যাকটি তৈরি করার জন্য আপনাদের একটি পাত্রের মধ্যে গ্রিন টি বানিয়ে রেখে দিতে হবে। তারপর তা ঠাণ্ডা করার পর আইস ট্রে’তে ঢেলে ফ্রিজে রেখে দিন। ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা মত ফ্রিজে রাখুন। তারপর এটি ব্যবহার করুন যে ভাবে আইস কিউব মুখে লাগায় ঠিক সেই ভাবে। মোটামুটি মিনিট কুড়ি সময় পরে ভালো করে একবার মুখ ধুয়ে নেবেন। এই ফেসপ্যাক ব্যবহারের ফলাফল কিন্তু আপনারা কয়েকদিনের মধ্যেই হাতেনাতে দেখতে পাবেন।

২) শসার আইস ফেসপ্যাক:

এই ফেসপ্যাক মুখ উজ্জ্বল করতে চোখের নিচের কালি দূর করার পাশাপাশি আমাদের স্কিন থেকে সমস্ত রকমের মরা কোষ দূর করতে সাহায্য করে থাকে। এই প্যাকটি তৈরি করার জন্য শসার পেস্ট করে তা আইস’ট্রে তে রেখে জমাতে পারেন বা শসা গোল গোল করে কেটে আইস কিউবে রেখে সামান্য জল দিয়ে তা জমিয়ে নিতে পারেন। এবার ঠিক আগের বারের মতন করেই আইস কিউব গুলিকে আপনারা প্যাক হিসেবে ব্যবহার করে নিতে পারেন। অন্ততপক্ষে সপ্তাহে তিন দিন আপনাদের এই প্যাক কিন্তু ব্যবহার করতে হবে।

৩) অ্যালোভেরা আইস ফেসপ্যাক:

ত্বকের যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে এবং ত্বককে উজ্জ্বল করার ক্ষেত্রে এই ফেসপ্যাকের কিন্তু একটি আলাদা রকমের গুরুত্ব রয়েছে। স্কিন উজ্জ্বল করা, ব্রণ দূর করা, ডার্ক সার্কেল সরানো হাজার একটা সমস্যার সমধান রয়েছে এতে। পাশাপাশি এটি কিন্তু টোনার হিসেবেও আমাদের ত্বকের উপর কাজ করে থাকে। এই প্যাকটি তৈরি করার জন্য অ্যালোভেরা জেল ট্রেতে রেখে ফ্রিজে আইস কিউব তৈরি করে নিন। এরপর মিনিট দশেক সময় পর্যন্ত ভালো করে মাসাজ করতে থাকুন। এই ফেস প্যাকটি কিন্তু আপনারা চাইলে রোজ ব্যবহার করতে পারেন। কতটা কার্যকরী তা আপনারা না হয় নিজেই বুঝে নেবেন।

৪) টমেটো আইস ফেসপ্যাক:

সানট্যান রিমুভ করার পাশাপাশি প্রাকৃতিকভাবে ব্লিচিং করতে এই প্যাক অত্যন্ত কার্যকরী। এই প্যাক ব্যবহার করলে কিন্তু আমাদের ত্বকের রুক্ষ ভাব ও সহজে দূর হয়ে যায়। কয়েকটি টমেটো নিয়ে পেস্ট তৈরি করে তা ভালো করে জমিয়ে আইস কিউব তৈরি করে নিন। স্নানের আগে মুখে এই ফেসপ্যাকটি লাগিয়ে আলতো করে ম্যাসাজ করুন। অন্ততপক্ষে সপ্তাহে দুই দিন লাগালে কিন্তু আপনারা ফলাফল দেখে নেবেন।

৫) দুধের আইস ফেসপ্যাক:

এবারে আমরা এমন একটি ফেসপ্যাক এর কথা বলব যেটি রূপচর্চায় সর্বাধিক ব্যবহৃত দুধ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। দুধে থাকা ল্যাকটিক অ্যাসিড আমাদের মুখে বলিরেখা দূর করার জন্য অত্যন্ত কার্যকরী। পাশাপাশি এটি প্রাকৃতিকভাবে আমাদের স্কিনকে মশ্চারাইজ করে তোলে। দুধ ফ্রিজে জমিয়ে আইস কিউব বানিয়ে নিন প্রথমে।এবার মুখে এই আইস কিউব ফেস প্যাক হিসেবে ব্যবহার করুন। ৩০ মিনিট পর মুখ পরিষ্কার করে নিন, সময় থাকলে এটি রোজ একবার করে করা যেতে পারে।

৬) লেবুর আইস ফেস প্যাক:

আমাদের ত্বকের উজ্জ্বলতা বজায় রাখতে, ত্বক থেকে সানট্যান দূর করতে এবং মুখের সতেজতা বজায় রাখার জন্য এই প্যাক কিন্তু অত্যন্ত কার্যকরী। এই প্যাক তৈরির জন্য আপনারা পাতিলেবুর রস আইস ট্রেতে জমিয়ে কিউব তৈরি করে নিতে পারেন। তারপর মুখ ধুয়ে হালকা করে এটিকে সম্পূর্ণ মুখে মাসাজ করে নিন। ১৫ মিনিট পরে মুখ ধুয়ে নিলেই কিন্তু কাজ হয়ে যাবে।

৭) হলুদের আইস ফেসপ্যাক:

হলুদের উপকারিতা কিন্তু কারোর একেবারেই অজানা নয়। মুখের উজ্জ্বলতা বাড়ানো থেকে শুরু করে অন্যান্য নানান ধরনের ত্বকের সমস্যায় বহু যুগ ধরেই হলুদের ব্যবহার হয়ে আসছে। হলুদের ভেষজ গুনাগুন স্কিনের নানা রকমের রোগ থেকে আমাদের বাঁচাতে সাহায্য করে। হলুদের ফেসপ্যাক তৈরি করার জন্য প্রথমেই কাঁচা হলুদ বেটে তার থেকে আপনাদেরকে রস বের করে নিতে হবে। এরপর তার ডিপ ফ্রিজে রেখে কিছুক্ষণের মধ্যে আপনাদের বরফ তৈরি করে নিতে হবে। মুখে এটি লাগানোর পর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন মুখ শুকিয়ে এলে ফেস ওয়াস দিয়ে মুখ ধুয়ে নিন।

৮) তরমুজের আইস ফেসপ্যাক:

ত্বকের সফটনেস ধরে রাখতে কাজ করে তরমুজ। পাশাপাশি মরা কোষ দূর করে এই ফেসপ্যাক স্কিনকে ভেতর থেকে রক্ষা করতেও সাহায্য করে থাকে। এই ফেস প্যাক তৈরি করার জন্য তরমুজ কেটে আপনাদের ভালো করে জমিয়ে নিতে হবে। তারপর এই আইস কিউব স্নান করার কিছুক্ষণ আগে ভালো করে মুখে ব্যবহার করে নিলেই ত্বকের সম্পূর্ণ জেল্লা আপনারা ধীরে ধীরে ফেরত পেয়ে যাবেন।

৯) মুলতানি আইস ফেস প্যাক:

ঘরোয়া ভাবে ফেসিয়াল করার জন্য এই ফেসপ্যাক কিন্তু দারুন কার্যকরী। মুখের সমস্ত ময়লা দূর করার পাশাপাশি ব্রণ থেকে আমাদের ত্বককে রক্ষা করার জন্যও এই ফেসপ্যাক ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এটি তৈরি করার জন্য। মুলতানি মাটি জলে গুলে লিকুইট মত বানিয়ে তারপর তা জমাতে হবে ফ্রিজে। তারপর ফেস প্যাকের মতন ভালো করে ব্যবহার করে কিছুক্ষণ পর মুখ শুকিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। অন্ততপক্ষে সপ্তাহে চার দিন আপনারা এই ফেসপ্যাকটি ব্যবহার করতে পারেন।

১০) গোলাপজল আইস ফেস প্যাক :

টোনার হিসেবে এবং মেকআপ ওঠানোর জন্য এটি কিন্তু দারুণ কার্যকরী। গোলাপজল আইস ট্রেতে রেখে ভালো করে জমিয়ে তা থেকে একটি আইস কিউব তৈরি করে নিন। এরপর প্রায় প্রতিদিন কিন্তু আপনারা স্কিন টোনিং করার জন্য এটিকে ব্যবহার করতে পারেন।

১১) মধুর আইস ফেসপ্যাক:

যদি আপনাদের ড্রাই স্কিন থাকে তাহলে সেই স্কিনকে সাধারণ করার জন্য মধু কিন্তু অসাধারণ ভাবে কার্যকরী। পাশাপাশি মধু মুখের ফ্যাকাশে ভাবকে দূর করে ত্বককে আরো উজ্জ্বল করে তোলে। পরিমাণ মতো মধু নিয়ে আইস ট্রেতে জমিয়ে তা থেকে বরফ তৈরি করে নিন এবং নির্দিষ্ট সময়ে এটি ভালো করে মুখে মাসাজ করতে থাকুন। সপ্তাহে তিন দিন এই ফেসপ্যাক ব্যবহার করলেই কাজ হবে।

১২) ধনেপাতার আইস ফেসপ্যাক:

আমাদের আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনের সব শেষে বলবো ধনেপাতা দিয়ে তৈরি আইস ফেসপ্যাক এর কথা। ত্বককে ভেতর ও বাইরে থেকে পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি সমস্ত মরা কোষ দূর করতে এই ফেসপ্যাক কিন্তু দারুণ কার্যকরী। এই ফেস প্যাকটি তৈরি করার জন্য আপনাদের প্রথমে কয়েকটি ধনেপাতা নিয়ে তা বেটে ভালো করে রস বের করে নিতে হবে। এবার এই রস আইস ট্রেতে জমিয়ে মুখে ব্যবহার করুন। চাইলে আপনারা এই ফেসপ্যাক দিনে দুবার অর্থাৎ স্নানের আগে এবং ঘুমোনোর আগেও ব্যবহার করতে পারেন।

Back to top button