আজকের গল্প:- ‘মায়েরা এমনই হয়’! (সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

আজকের গল্প :- ‘মায়েরা এমনই হয়’!

আত্রেয়ী বোস, বোস পরিবারের কর্ত্রী। চল্লিশটা বছর হয়ে গেছে তিনি এই বাড়িতে বউ হয়ে এসেছেন। স্বামী আর তার একমাত্র ছেলে — এই নিয়েই তার ছোট্ট সংসার। তবে স্বামী রূপম বোস কাজের সূত্রে বেশির ভাগ সময়ে বাইরেই থাকেন। তাই বাড়ীতে শুধু আত্রেয়ী দেবী আর তার ছেলে অনুপম-ই থাকে। আর আত্রেয়ী দেবীর গল্প করার সাথী বলতে তার বাড়ির পরিচারিকা টিয়া। সেও প্রায় গত দশ বছর ধরে এই বোস বাড়িতে কাজ করছে। বাড়িতে টিয়া ছাড়া আর সেরকম কেউ কথা বলার লোকও নেই। আর আত্রেয়ী দেবীর ছেলেও তার কাজ, পড়াশোনা এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকে তাই ছেলের সাথেও খুব একটা গল্প করার সময় তিনি পাননা। তাই আত্রেয়ী দেবী ঠিক করেন এবার ছেলের জন্য বৌ আনবেন তাহলে তার সাথে কথা বলে, গল্প করে অন্তত সময় কাটানো যাবে আর ছেলেরও বিয়ের বয়স হয়েছে তাই বিয়েটা দেওয়াই যায়।

অবশেষে আত্রেয়ী দেবী তার মনের মতো একটা মিষ্টি মেয়ে আনলেন তার বাড়ির বৌমা করে। আর অনুপম নিজেও বেশ খুশি তার মায়ের পছন্দ দেখে তাই বিয়েটা সুষ্ঠুভাবেই সম্পন্ন হয়। বাড়িতে নতুন বৌ আনার পর আত্রেয়ী দেবীরও দিনগুলো বেশ ভালোই কাটতে থাকে। সারাদিন শাশুড়ি বৌমা মিলে গল্প করে, নতুন নতুন রান্না করে আর সিনেমা দেখেই দিনগুলো কাটিয়ে দেয়। আর নতুন বৌ শ্রীমাও ভীষণ ভালো, আজকালকার মেয়ে হয়েও সংসারের প্রতি সে খুবই দায়িত্বশীল। আর আত্রেয়ী দেবীকেও শ্রীমা ভীষণ ভালোবাসে। এইভাবেই দিনগুলো ওনাদের ভালোই কাটতে থাকে।
একদিন শ্রীমা আত্রেয়ী দেবীর কাছে একটা আবদার করলো…….

– বলছি মা, আমি একটা জিনিস ভেবেছি। বলবো?
– আরে আবার জিজ্ঞাসা করছিস কেন? বল না কি বলবি।
– আমি এবারে ঠিক করেছি যে বাড়িতে সরস্বতী পুজো করবো।
– বাঃ বেশ তো। ঠিক আছে করিস। তাহলে আমি ঠাকুরমশাইকে আসতে বলছি। কী কী লাগবে একটা লিস্ট করে নিস তাহলে।
– এইতো আমার মিষ্টি মা ( বলেই আত্রেয়ী দেবীকে আনন্দে জড়িয়ে ধরলো শ্রীমা )
এদিকে পুজোর দিন, সরস্বতী পুজো হয়ে যাওয়ার পর শ্রীমা ঠাকুরমশাইকে একটু অপেক্ষা করতে বললো…..
– ঠাকুরমশাই আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে যান, একটা কাজ বাকি আছে।

– আবার কি বাকি আছে রে? পুজোর সব নিয়ম মেনেই তো পুজো হলো। তাহলে? (আত্রেয়ী দেবী অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন। এদিকে বাকিরাও মানে রূপম বাবু আর অনুপমও বুঝতে পারছেনা যে শ্রীমা ঠিক কি করতে চাইছে)
একজনের হাতেখড়ি হবে ঠাকুরমশাই। তাই আপনাকেই তো সেটা করতে হবে তাইনা।
– সেকি রে! কার আবার তুই হাতেখড়ি দিবি? বাড়িতে তো কোনো ছোটো বাচ্চাও নেই ?
– আজকে তোমার হাতেখড়ি হবে মা, বুঝেছো? (বলেই মিটিমিটি হাসতে থাকে শ্রীমা)
– কীইইই? কার হবে? ( আত্রেয়ী দেবী অবাকের চরম সীমায় পৌঁছে গেছে )
– উফ্ মা! তোমার হবে গো তোমার।
– কী যাতা বলছিস তুই?

– হুম, ঠিকই বলেছি। ছোটো থেকেই তো তোমার পড়াশোনার ভীষণ সখ ছিল কিন্তু অত ছোটবেলায় বিয়ে হয়ে যাওয়ায় তুমি আর পড়তে পারোনি। তুমিই তো সেদিন আমায় বলেছিলে আর এরই মধ্যে ভুলে গেলে? তাই আমি ঠিক করেছি তুমি আবার পড়াশোনা শুরু করবে। পড়াশোনার তো আর কোনো বয়স হয় না তাই না? আমিই তোমায় রোজ পড়াবো । তাতে তোমারও ভালো লাগবে আর আমার তো খুবই ভালো লাগবে।

– হ্যাঁ, তখন কম বয়সে সখ ছিল।কিন্তু এখন আমি শাশুড়ি হয়ে গেছি আর কদিন পর ঠাকুমা হবো। এখন এসব ছেলেমানুষী চলে নাকি? আর লোকে কী বলবে? সবাই হাসাহাসি করবে আমায় নিয়ে। না না এসব তুই বাদ দে মা। ওসব এই বুড়ো বয়সে আমার দ্বারা হবে না।
– তুমি এখানে চুপটি করে বোসো তো দেখি। আর কোনো কথা নয়।
– আরে তোমরা কিছু বলো! কি শুরু করেছে এই মেয়ে! ( রূপম বাবু আর ছেলে অনুপমকে উদ্দেশ্য করে বললো আত্রেয়ী দেবী )
– আ…আমি বাবা নেই তোমাদের শাশুড়ী বৌমার মাঝে। আর বৌমা তো ঠিকই বলেছে। তুমি আবার শুরু করো। আর আমিও তো তোমায় বিয়ের পরে বলেছিলাম পড়াটা চালিয়ে যেতে কিন্তু তুমিই না করে দিয়েছিলে। নাও এখন বৌমার বকা খেয়ে যদি আবার পড়াটা শুরু হয় তো ভালোই তো। ( রূপম বাবু বললেন )

– হ্যাঁ মা, শ্রী তো ঠিকই বলেছে। তুমি আবার শুরু করো। তাছাড়া পড়াশোনার কোনো বয়স নেই। আর তুমি সমাজের কথা বলছো? ওদের নিয়ে পড়ে থাকলে তো কিছুই জীবনে করা যাবে না তাইনা? তাই লোকে কী বললো সেসব না ভেবে তোমার যেটা ভালোলাগে করো বুঝলে? ( ছেলে অনুপমও শ্রীমাকে সাপোর্ট করে বললো )
– নাও মা এবার ভালো মেয়ের বোসো দেখি। নিন ঠাকুরমশাই যা যা করার করে ফেলুন আর এই নিন হাতেখড়ির স্লেট আর পেন্সিল।
আত্রেয়ী দেবী আর কিছু বলতে পারেন না। তার আনন্দে দুটো চোখ ভিজে যায়। এই জন্য না যে তার আবার নতুন করে পড়াশোনা শুরু হচ্ছে। তার বৌমা,স্বামী, ছেলে এরা যে তার কথা ভেবে এত কিছু করলো সেটা ভেবেই আনন্দে চোখে জল চলে আসছিল।

– কী হলো আবার কান্নাকাটি কেন ? উফ্ মা তুমি বড্ড ছিঁচকাঁদুনে তো!
– একটু এদিকে আয় তো মা।
( বলেই শ্রীমাকে দুহাত দিয়ে বুকে জড়িয়ে নিলেন আত্রেয়ী দেবী, আর ওদের শাশুড়ী বৌমার এই সুন্দর মুহূর্ত ছেলে আর বাবা একেবারে খুশিতে আটখানা হয়ে দেখতে লাগলো। )

সত্যিই তো, পড়াশোনার কি কোনো বয়স হয় নাকি? শুধু আমরা সমাজের আর সময়ের দোহাই দিয়ে থাকি। কিন্তু কোনো কিছু মন থেকে ভালোবাসলে সেটা যেকোনো সময়ই শুরু করা যায়। শুধু সেটা শুরু করাবার জন্য জীবনে শ্রীমার মতো একজনের প্রয়োজন। যে আবার আমাদের মনের মধ্যে আবদ্ধ থাকা সেই সখ, সেই ভালোবাসার জিনিসটাকে আবার বের করে আনতে পারবে।।

লেখায়: চন্দ্রাণী দাস
ছবি: ইন্টারনেট

Back to top button