আজকের গল্প – ‘বৌমা নয় মেয়ে…!!’ (সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

আমি জানি আড়িপাতা ভালো না, তবুও বৌমার ঘরে আমি আজ আড়ি পেতে শোনার চেষ্টা করছি সে উজানকে কি কান পড়া দেয় ! আমার একমাত্র ছেলে উজানকে এক মাস হলো অনেকটা আমার অমতেই বিয়ে দিয়েছিলাম । আমার পছন্দ করা মেয়েকে উজান বিয়ে করেনি, করছে তার পছন্দের মেয়ে নিতুকে। দেখতে শুনতে খুব একটা খারাপ না নিতু,গায়ের রং যদিও শ্যামলা তবে ওর চেহারায় একটা মায়াবী ব্যাপার আছে। চোখে কাজল দিয়ে ঠোঁটে হালকা ভ্যাজলিন দিলেই সুন্দরের মাথা খাওয়া রূপ যেন উথলে পড়ে !

নিতু একটু চুপচাপ স্বভাবের মেয়ে , এম এ পাশ নিতুকে আমি কিছু বললে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে কাজে কর্মে আমাকে সাহায্য করতে আসে, তবে আমি অতোটা পাত্তা দেই না। তিল তিল করে গড়ে তোলা আমার সংসার । যেই সংসারে আমার একমাত্র সম্পদ , আমার বেঁচে থাকার উৎস ,আমার একমাত্র সন্তান উজান তাকেই, এই নিতু হাত করে নিয়েছে ! ওকে আমি এতো সহজে কি করে মেনে নেই ! নিতু আমার সাথে মিশতে চায় ! সঙ্গ দিতে চায় । বিকালে আমি যখন একা বারান্দায় বসে সুঁই সুতো নিয়ে বেড কাভারে ফুল তুলতে ব্যস্ত থাকি, তখন নিতু দুই কাপ রং চা নিয়ে হাজির হয় । হয়তো উজানের কাছে শুনেছে আমি দুধ চা পছন্দ করি না।

চা নিয়ে নিতু যখন আমার কাছে গল্প করতে আসে নিজেকে সামলাতে পারি না তখন নানা অজুহাতে চিনি হয়নি, জল ঠিক মতো ফোটেনি , একটু আদা চা করে দাও , একটু লেবুর রস দিয়ে আনো – এসব বলে ওকে দূরে সরিয়ে রাখি। আমার বারবার কেবলই মনে হয় এই মেয়ে নিশ্চয়ই জাদুটোনা করে আমার একমাত্র ছেলেকে হাত করেছে। নয়তো স্বামী মারা যাবার পরে যে সন্তানকে বুকে পিঠে করে এতো কষ্ট সহ্য করে মানুষ করলাম, যে সন্তান কোনদিন আমার মুখের উপরে একটা কথাও বলেনি সে সন্তান কেমন করে আমার বান্ধবীর মেয়ে শান্তাকে বিয়ে করতে অস্বীকার করলো! শান্তা দেখতে নিতুর চেয়ে অনেক ফর্সা আর শিক্ষিতা।

ধনী বাবার একমাত্র সন্তান শান্তা, আমার উজানটা যখন ভালো চাকরি পেল তখন আমার বান্ধবী ও তার স্বামী নিজের থেকেই উজানর সাথে শান্তার বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। আমি সেদিন ভীষণ খুশি হয়েছিলাম, সারাজীবন তো নানান অর্থ কষ্ট সহ্য করেছি, লোকের অবহেলা সহ্য করেছি , ভালো কোন অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করিনি। আজ উজান যখন ভালো চাকরি পেল তখন চৌধুরী বংশের মেয়ে শান্তাকে ঘরে তুলে আমার ছোট্ট সুখের সংসারকে আভিজাত্যে ভরিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। আমি আমার সন্তানকে চিনি, সে আমার কথার অবাধ্য হবে না – এই বিশ্বাস নিয়েই ওদের কথা দিয়েছিলাম শান্তাকেই উজানের বৌ করে ঘরে তুলবো কিন্তু উজান সেইদিন প্রথমবারের মতো আমার বিশ্বাস ভেঙেছে ! আমার পছন্দ করা মেয়ে শান্তাকে সে বিয়ে করতে কিছুতেই রাজি হয়নি।

ছেলেকে নিয়ে আমার এতোদিনের সমস্ত অহংকার সেদিন এক নিমিষেই শেষ হয়ে গেছে। আমি আমার বান্ধবী ও তার স্বামীর কাছে কড়জোর করে ক্ষমা চেয়েছি, মনে মনে ভীষণ ছোট হয়ে গিয়েছি। নিতু মেয়েটা নিশ্চয়ই আমাকে নিয়ে নানান কথা শুনিয়ে শুনিয়ে ছেলের কান ভারি করছে ! দুই দিন ধরে লক্ষ্য করছি ছেলে অফিস থেকে এসেই সোজা তার ঘরে চলে যায় । আগে তো আমার ছেলে এমন করতো না ! অফিস থেকে এসেই সোজা আমার খোঁজ করতো।

আমাকে জানতেই হবে উজানকে নিতু আমার সম্পর্কে কি বলে তার কান-মন বিষিয়ে তুলেছে ! ঘরের ভেতরে কি কথা হচ্ছে তা আমাকে জানতেই হবে, আর এ কারনেই আমি আঁড়ি পেতে শোনার চেষ্টা করছি ! নাহ্ । তেমন কিছুই ঠিক বোঝা যাচ্ছে না শোনাও যাচ্ছে না তবে পর্দার আড়াল থেকে দেখলাম উজান একটা শাড়ির প্যাকেট আর একটা গহনার বাক্স এনে নিতুর হাতে দিল , নিতু শাড়ির প্যাকেটটা খুলে দেখলো গহনার বাক্সটাও খুলে দেখলো। মুচকি হাসি দেখেই বোঝা যাচ্ছে নিতুর গহনা ও শাড়ি দুটোই খুব পছন্দ হয়েছে।

এরপর উজান আলতো করে নিতুকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। ওদের এই আদিখ্যেতা আর আহ্লাদ দেখে আমার সমস্ত শরীর রাগে ঝিমঝিম করতে লাগলো। আমি দরজার পাশ থেকে সরে ওয়াস রুমে চলে গেলাম। খেয়াল করলাম রাগে ,দুঃখে, বিরক্তিতে আমার চোখ বেয়ে জল ঝড়ছে। কলের ঠান্ডা জলের ঝাপটা চোখে মুখে দিয়ে আমার ঘরে এসে আলো নিভিয়ে শুয়ে পরলাম। এই ঘটনার মিনিট পনের পরে উজান এলো। আমার পাশে বসে মাথায় হাত দিয়ে আলতো করে আঙুল বুলিয়ে ডাকছে- – মা, মা, ওঠো খাবে না! এই অবেলায় শুয়ে আছো যে! শরীর খারাপ করে নি তো? আমি উজানের ডাকে কোন পাত্তা দিলাম না। চুপ করে আছি। উজান আমার কপালে হাত দিয়ে দেখলো জ্বর আছে কিনা।

না জ্বর নেই- মা, প্লিজ ওঠো। তোমার সাথে খাবো। ওঠো তো। উজান একপ্রকার জোর করেই আমাকে শোয়া থেকে তুললো। আমি ভীষণ বিরক্ত হয়ে গেলাম। বললাম – খোকা তুই এতো জ্বালাচ্ছিস কেন বলতো? আমি খাবো না । যা , তুই তোর বৌয়ের সাথে খেয়ে নে। বিরক্ত করিস না তো! উজান আমার কথাটা না শোনার ভান করে আমার মুখে হাত দিয়ে কথা বন্ধ করে দিল। বললো- এতো অভিমান কেন আমার মায়ের !? আমি ওর কথার কোন উত্তর খুঁজে পেলাম না। সত্যি তো আমার কিসের অভিমান ! স্বামী তার স্ত্রীকে ভালোবাসবে এটাই তো হওয়া উচিত ।

আমার তো জীবনের একটাই চাওয়া ছিল, তা হলো আমার উজান যেন সুখী হয়, সেই উজান যখন নিতুকে পেয়ে সুখী ,তখন আমি কেন মন ভার করে আছি ? নিজের কাছে নিজেকেই খুব ছোট মনে হতে লাগলো। নিজের ভুল আমি বুঝতে পারলাম। তবুও অজানা এক আড়ষ্টতা যেন আমাকে ঘিরে ধরেছে। আমি কিছুই বলতে পারলাম না। চুপ করে রইলাম। উজান আমার হাত ধরে ডাইনিং এ নিয়ে এলো। নিতু টেবিলে খাবার গোছাচ্ছে।

খেয়াল করলাম খাবার টেবিলে শোভা পাচ্ছে  বিরিয়ানি , ! মেয়েটা স্যালাড খুব ভালো বানায়। পেঁয়াজ, মরিচ, ধনিয়া পাতার কুঁচি যখন একটু লবণ, আর সরষের তেল দিয়ে কচলে মাখিয়ে নেয় তখন সব মসলার একটা চমৎকার সুগন্ধ এসে নাকে লাগে। এরপর সূক্ষ্ম ভাবে কাটা টমেটো, শশা আর গাজর কুচি দিয়ে দ্বিতীয় দফা মেখে হাল্কা লেবুর রসের এ স্যালাড টা আমার অসম্ভব ভালো লাগে। আমার নিজের হাতে করলেও এই স্যালাড অতোটা ভালো হয়না।

খেয়াল করলাম টেবিলের এক কোণে একটি কেকও রাখা আছে। আমি মনে মনে ভাবি ,- ও ,এই ব্যাপার! নিশ্চয়ই আজ নিতুর কোন স্পেশাল দিন! আর এজন্যই এতো আয়োজন! নিতু মোমবাতি আর ছুরি নিয়ে কেক হাতে আমার দিকে এগিয়ে এলো। কেকের গায়ে লেখা “Happy Birthday Ma” আমি যেন লজ্জায় কুঁকড়ে গেলাম। ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠলো। বললাম – – এসব কি করেছিস খোকা! – না মা। এ আয়োজন আমার নয় তোমার বৌ-মায়ের।

গতো পরশু থেকে নিতু আজকের জন্য অপেক্ষা করছিল ! নিতু আমার হাতে সেই শাড়ির প্যাকেট আর গহনার বাক্স দিয়ে বললো- দেখুন তো মা আপনার পছন্দ হয় কিনা! আমি লক্ষ্য করলাম এবারও আমার চোখ বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা জলের ধারা বয়ে চলছে বুক অবধি। কিন্তু কোন রাগ, ক্ষোভ, অভিমান বা বিরক্তি এই ধারার সূত্র নয়। নিতু শাড়ির প্যাকেট থেকে একটি কলা পাতা রংয়ের জামদানি শাড়ি বের করলো , গহনার বাক্স মেলে ধরলো। – মা আমি জানি আপনার জামদানি শাড়ির খুব শখ, দেখুনতো পছন্দ হয়েছে কিনা। ওকে বললাম জলপাই রংয়ের একটা জামদানি এনো, আনলো এই কলাপাতা রংয়ের , কিন্তু মা এই শাড়িতেও আপনাকে খুব মানাবে।

এই গহনা গুলো দেখেন তো ঐ ছবির মতো হলো কিনা! আমি লক্ষ্য করলাম, উজানের বাবার গড়িয়ে দেয়া সেই কানের ঝুমকো আর গলার হার। অবিকল সেই ডিজাইন। কিন্তু এই গহনা তো আমি মিজানের পড়ার খরচ যোগাতে আট দশ বছর আগেই বিক্রি করে দিয়েছিলাম ! – জানো মা, নিতুর একটাই বায়না, মাকে তার গহনা এনে দাও ! এই ছবি দেখিয়ে সোনার দোকানে অর্ডার দিয়ে তারপর সে ক্ষান্ত হলো। নিতু আমার হাত দুটো ধরে বললো- – আমি ছোট বেলায় মা-বাবাকে হারিয়ে মামার কাছে বড় হয়েছি । অভাব অনটন বুঝিনি তবে মায়ের আদর কক্ষনো পাইনি ।

আমার একটা চাওয়া, আপনি পূরণ করবেন মা? আমার শাশুড়ি না , মা হবেন ? নিতুর গলা ভারি হয়ে চোয়ালে কথা গুলো আটকে যাচ্ছে ; আমি নিতুকে এই প্রথমবার জড়িয়ে ধরলাম। বুকের ভেতরে একটা প্রশান্তির আলোয় ভরে গেল। নিতুকে বুকে নিয়ে আদোর করে কপালে চুমু খেয়ে বললাম- পাগলী মেয়ে আমার। তুই তো আমার মেয়েই। আমার ছোট্ট সংসারটা এক মুহূর্তেই দুনিয়ার সেরা সুখোদ্যানে পরিণত হলো।

Back to top button