ছিল না কোনো সন্তান! শেষ বয়সে ভোগেন একাকীত্বে, স্বর্ণযুগের বাঙালি অভিনেত্রী মঞ্জু দে’র এই অজানা কাহিনী আনবে চোখে জল

নিজস্ব প্রতিবেদন: বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগের একজন প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী হলেন মঞ্জু দে। ৫০ থেকে ৬০ এর দশকে একের পর এক বাংলা সিনেমাতে অনবদ্য অভিনয় করে দর্শকদের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা তার জীবনেরই কিছু কথা নিয়ে আলোচনা করতে চলেছি। আজকালকার সময় হয়তো কম বেশি অনেকেই কিন্তু তাকে চেনেন না।

তবে যারা তার অভিনয় দেখেছেন তারা সকলেই জানেন তার মধ্যে কতটা প্রতিভা রয়েছে। ১৯২৬ সালের ৭ই মে বহরমপুরে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন এই অভিনেত্রী। তার বাবা ছিলেন অমরেন্দ্রনাথ মিত্র এবং মা কমলা মিত্র। বহরমপুর এবং পাটনা মিলিয়ে ছিল তার স্কুল জীবন। লেখাপড়ার সাথে খেলাধুলাতেও পারদর্শী ছিলেন এই অভিনেত্রী। কলকাতার আশুতোষ কলেজ থেকে তিনি স্নাতক হন।

কলেজে পড়াকালীন আচমকাই অভিনেত্রীর কাছে সিনেমায় অভিনয় করার প্রস্তাব আসে। সালটা ছিল তখন ১৯৪৫। পরিচালক সুশীল মজুমদার তার হিন্দি ছবি ‘সিপাহী কা স্বপ্না’ ছবিতে মঞ্জু দেবীকে অভিনয়ের সুযোগ দেন। চরিত্রটি খুবই ছোট ছিল, পাশাপাশি সিনেমাটাও খুব বেশিদিন চলেনি। এরপর ১৯৪৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পড়াকালীন মঞ্জু দেবীর বিয়ে হয়ে যায় দেবব্রত দে’র সঙ্গে।

বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ির অনুমতিতেই পুনরায় অভিনয় জগতে পা রাখেন মঞ্জু। ‘৪২’ ছবিতে প্রথমবার তিনি নায়িকা হন। ১৯৫১ সালে এই ছবিটি মুক্তি পায় এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। কেরিয়ার এর এই দ্বিতীয় ছবি দিয়েই ইন্ডাস্ট্রিতে বিশাল পরিচিতি পান মঞ্জু। এই ছবিতে তার অভিনয় দেখে তিন জন পরিচালক তাকে তাদের আপকামিং তিনটি ছবির জন্য বেছে নেন।

ছবি তিনটি হল দেবকি কুমার বসু পরিচালিত ‘রত্নদ্বীপ’, সঞ্জয় কর পরিচালিত ‘জিঘাংসা’ এবং কালিকাদাস বটব্যাল পরিচালিত ‘পলাতকা’। এরপর নরেশ মিত্র তাকে নিয়তি ছবির জন্যেও বেছে নেন। ১৯৫১ সালে পরপর তার এই চারটি ছবি মুক্তি পায়। এই ছবিগুলি মুক্তির পরে মঞ্জু দেবী কে আর কখনো পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এরপর উপহার, কাবুলিওয়ালা, বড়দিদি, গৃহ প্রবেশ, প্রভাতের রং প্রভৃতি সুপারহিট ছবিতে দেখা যায় তাকে।

এছাড়াও মৃণাল সেন, তরুণ মজুমদার এবং সুধিম মুখোপাধ্যায় সহ বহু পরিচালকের ছবিতে কাজ করতে দেখা যায় তাকে। পর্দায় তার বিপরীতে কখনো ছিলেন বিকাশ রায়, কখনো প্রদীপ কুমার আবার কখনো কালি ব্যানার্জি অথবা অসিত বরণ প্রমুখরা। মঞ্জু দে মহানায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গেও অভিনয় করেছেন। বউ ঠাকুরানীর হাট, পুনর্মিলন, উপহার ছবিতে তাকে দেখা গিয়েছিল।

অভিনয় ছাড়াও ছবি পরিচালনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন এই অভিনেত্রী। তার পরিচালিত প্রথম ছবি স্বর্গ থেকে বিদায় মুক্তি পায় ১৯৬৪ সালে। ষাট — সত্তরের দশকে তিনি কিন্তু পেশাদারী মঞ্চেও কাজ করেছেন। স্টার থিয়েটার থেকে শুরু করে মিনার্ভা বা বিশ্বরূপা অনেক জায়গাতেই কিন্তু দেখা গিয়েছে তাকে। ১৯৮০ সালে তরুণ মজুমদারের পরিচালনায় মুক্তি পাওয়া পথভোলা ছবিটি হল মঞ্জু দে অভিনীত শেষ ছবি।

তবে জানেন কি এত কর্মব্যস্ত মানুষটি শেষের দিকে নিজেকে একেবারে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। সত্যি কথা বলতে খানিকটা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন তিনি। ঘটনাচক্রে তিনি পরিচিত হয়েছিলেন ভবানীপুরের ইন্দ্র রায় রোডের সুভাষগ্রামের প্রধান স্বামী সুবানন্দের সঙ্গে। ১৯৮২ সালের মার্চ মাসে তিনি এখান থেকেই দীক্ষা নেন। এই থেকেই গুরুদেব তার জীবনের সব।

শেষ জীবনে ধর্মচর্চায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করেছিলেন মঞ্জু দেবী। ১৯৮৯ সালের ৩০ শে সেপ্টেম্বর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার অভিনীত ছায়াছবি গুলি আজও দর্শক মনে তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনটি আপনাদের কেমন লাগলো তা অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কিন্তু জানাতে ভুলবেন না।

Back to top button