বাড়িতেই খুব সহজ এই দুর্দান্ত ঘরোয়া পদ্ধতিতে করুন মাশরুম চাষ, মাত্র কয়েকদিনেই পাবে দারুণ ফলন!

নিজস্ব প্রতিবেদন:- মাশরুম খেতে কিন্তু কমবেশি অনেকেই পছন্দ করে থাকেন। তবে এটার মধ্যে কতটা পরিমাণে পুষ্টিগুণ রয়েছে তা হয়তো সকলেরই অজানা। সাধারণত মাশরুম খেতে গেলে কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বেশি অনেক মানুষ বাজারের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকেন। তাই আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা আপনাদের সঙ্গে আলোচনা করে নিতে চলেছি মাশরুম চাষের পদ্ধতি। যদি আপনারা বাড়িতে এটি চাষ করতে চান এবং তা থেকে উপার্জন করতে চান সেক্ষেত্রে অবশ্যই কিন্তু আমাদের এই প্রতিবেদনটি শেষ পর্যন্ত পড়তে পারেন।

প্রসঙ্গত আমাদের দেশে মাশরুমের তিনটি প্রজাতি প্রচলিত রয়েছে। এগুলি হল বাটান (বোতাম) ধিংরি (ঝিনুক) এবং দুধিয়া (দুধিয়া) মাশরুম। তবে অনেকেই জানেন যে অয়েস্টার মাশরুম পুষ্টি এবং স্বাদ উভয় দিক থেকেই বাটান মাশরুমের চেয়ে ভালো। বাজার থেকে কিনলে মাশরুমের মধ্যে দামি হচ্ছে এই বোতাম বা বাটান মাশরুম। চলুন এবার চাষের পদ্ধতি জেনে নেওয়া যাক।

মাশরুম চাষ করতে প্রয়োজনীয় উপকরণ:

মাশরুম চাষের জন্য সবার প্রথমেই প্রয়োজন খড়। এর পরে আপনি যে কোনও পুরানো ব্যবহৃত পলিথিন নিন। যা আপনি প্রথমে ভালোভাবে ধুয়ে শুকিয়ে নেবেন। এছাড়াও একটি পুরানো ঝুড়ি, পাটের ব্যাগ, এমনকি একটি প্লাস্টিকের বোতলও ব্যবহার করতে পারেন। আর প্রয়োজন মাশরুমের বীজ বা স্পনস। যারা চাষ শুরু করতে চাইছেন তারা কিন্তু প্রথমেই এই সমস্ত উপকরণ গুলি ভালো করে সংগ্রহ করে নেবেন যাতে কাজ শুরুর পর আপনাদেরকে আর কোন রকমের অসুবিধার মুখোমুখি না হতে হয়।

মাশরুম চাষের পদ্ধতি:

১) উপযুক্ত জায়গা নির্বাচন:

মাশরুম চাষের জন্য আপনাদের এমন জায়গা খুঁজে বের করতে হবে যেখানে আদ্রতা এবং অন্ধকার দুটোই রয়েছে। টেবিলের নীচে বা আপনার বারান্দায় একটি শেড তৈরি করে বা কার্ডবোর্ডে রেখে মাশরুম চাষ করতে পারেন। জায়গাটির যতটা সম্ভব আলো আর তাপমাত্রা কম থাকবে ততই কিন্তু ভালো। এরপর আপনাকে খড় প্রস্তুত করে নিতে হবে। এই ক্ষেত্রে আপনারা হলুদ রঙের শুকনো খড় ব্যবহার করার চেষ্টা করবেন।এটিকে ৬-৭ ইঞ্চি আকারে কেটে নিন। এই খড় সারারাত জলে ভিজিয়ে রাখুন এবং সকালে বের করে নিন। এবার গরম জলে সেদ্ধ করে এগুলিকে শুকিয়ে এমন ভাবে তৈরি করুন যাতে প্রয়োজনীয় আদ্রতা থাকে।

২. ভুসি প্রস্তুত করার পদক্ষেপঃ

এবার চলে আসা যাক মাশরুম চাষের দ্বিতীয় ধাপে। এখানে আপনাদের প্রথম এই মাশরুমের বীজ প্রস্তুত করে নিতে হবে। একটি পরিবারের জন্য ৫ কেজি খড়ে জন্মানো মাশরুম যথেষ্ট। যাতে খড়ের পরিমাণ অনুযায়ী ২% বীজ দিতে হবে।

  • প্রথমেই আপনাদের বপন করে নিতে হবে। এর জন্য খড়ের মধ্যে বীজ ছিটিয়ে দিন। তারপর ভালোভাবে এটি মিশিয়ে পলিথিন ব্যাগে ভরে ফেলতে হবে। এরপরপ্রথমে পলিথিনে খড়ের একটি স্তর রাখতে হবে। তারপরে মাশরুমের বীজ রাখবেন। তারপর খড়ের দ্বিতীয় স্তর এবং তারপর বীজ যোগ করুন। এটি করার সময়, পুরো পলিথিন ব্যাগটি পূরণ করুন এবং তারপরে এটির উপরে একটি গিঁট বেঁধে দিন।
  • দ্বিতীয় ধাপে ভুসি এবং মাশরুমের বীজ দিয়ে ব্যাগ ভর্তি করার আগে, নীচে এবং তার চারপাশে ছোট গর্ত করে নিতে হবে।গর্তের আকার এমন রাখতে হবে যাতে বাতাস সহজেই এটি দিয়ে যেতে পারে।
  • এবার খড় আর বীজ দিয়ে আপনাদের ভালো করে ব্যাগ পূরণ করে দিতে হবে। এটি উপরে বেঁধে রাখুন এবং আপনার নির্বাচিত জায়গায় রাখুন। মাশরুমের তাপমাত্রা ২০ থেকে ২৮ ডিগ্রি এবং অন্ধকারও হওয়া উচিত। যদি তাপমাত্রা বেশি হয় তবে আপনি ব্যাগের উপর জল ছিটিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারেন।

৩)বীজ লাগানোর পর চেক করাঃ

মাশরুম ব্যাগ প্রস্তুত করার মোটামুটি তিন দিন পরে এটিকে আপনাদের খোলার চেষ্টা করতে হবে। যদি খড়ের সর্বত্র সাদা রঙের জাল দেখতে পান তবে এর অর্থ মাশরুম বাড়তে শুরু করেছে। এবার আবার বন্ধ করে একটি ভেজা কাপড় বা ভেজা বস্তা চাপা দিয়ে রাখুন। আদ্রতা বজায় রাখার জন্য কিন্তু সময়মতো এই কাপড়ের উপরে আপনাদের জল স্প্রে করতে থাকতে হবে। খেয়াল রাখবেন যাতে ব্যাগের মধ্যে জল জমে না যায়। তাহলে কিন্তু তা পরিষ্কার ও করে দিতে হবে।

৪)কুঁড়ি দেখতে পাবেনঃ

মাশরুম বাড়ছে মোটামুটি কিন্তু তিন সপ্তাহ মতন সময় লাগে। তবে তিন সপ্তাহ পরে এই মাশরুম একেবারে দ্রুতগতিতে বাড়তে শুরু করবে।সপ্তাহ পরে, কাপড়টি সরিয়ে ব্যাগের দিকে তাকান। দেখবেন গর্ত থেকে ছোট ছোট সাদা মাশরুমের কুঁড়ি বের হচ্ছে। যখন এই কুঁড়িগুলো দেখতে পাবেন তখন আপনি পলিথিন খুলে রাখতে পারেন বা কোথাও ঝুলিয়ে রাখতে পারেন। কুড়ি তৈরি হয়ে যাওয়ার সপ্তাহখানেকের মধ্যেই কিন্তু ধীরে ধীরে আপনারা ফসল পেতে শুরু করবেন। পরিমান আপনারা নিজেরাই বুঝে যাবেন।

৫)মাশরুমের বড় গুচ্ছে পরিনতিঃ

প্রথমে গর্ত থেকে একটি কুঁড়ি বেরিয়ে আসতে দেখবেন। যা কিছু দিনের মধ্যে ঝিনুক মাশরুমের একটি বড় গুচ্ছে পরিণত হবে। যখন এই গুচ্ছ উপরের দিকে ঘুরতে শুরু করবে তখন আপনি মাশরুম সংগ্রহ করতে পারেন। প্রথম ফসল পেয়ে যাবার পর মাশরুম কেটে নিন। প্রথম ফসলের প্রায় ১০ দিন পরে দ্বিতীয় ফসল পাবেন, অর্থাৎ একই ব্যাগ থেকে দ্বিতীয় ফসল এবং তারপরে প্রায় ১০ দিন পর তৃতীয় ফসল।

৬) নিয়মিত মাশরুম উৎপাদন করার উপায়ঃ

একক ব্যাগ দিয়ে আপনি প্রায় দুই-তিন মাস মাশরুম পেতে পারেন। চাইলে ১ কেজি খড়ের ৩-৪ টে ব্যাগ তৈরি করতে পারেন। কয়েক দিনের ব্যবধানে ব্যাগ রাখতে পারেন যেমন প্রথম সপ্তাহে আপনি দুটি ব্যাগ রাখলেন এবং তারপরে দ্বিতীয় সপ্তাহে আরও দুটি। তবে নিয়মিত জল ছিটিয়ে কিন্তু অবশ্যই আপনাদের সময় মতন আদ্রতা বজায় রাখতে হবে যাতে ফলনে কোন রকমের সমস্যা না হয়।।

সবশেষে বিশেষ কয়েকটি কথা বলব আপনাদের উদ্দেশ্যে।

প্রথমতঃ যতক্ষণ পর্যন্ত না খড় সম্পূর্ণরূপে কালো হয়ে যাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত আপনারা এটা থেকে মাশরুম চাষ করতে পারবেন। কালো হয়ে গেলে কিন্তু আপনাদের এটা ফেলে দিতে হবে।

দ্বিতীয়তঃ যদি বেশি মাশরুম উৎপাদিত হয়ে থাকে এবং আপনি সেগুলি সম্পূর্ণরূপে ব্যবহার করতে সক্ষম না হন তবে ফ্রিজে মাশরুম সংরক্ষণ করতে পারেন। অথবা রোদে ভালো করে শুকিয়ে এয়ারটাইট জারে রেখে দিতে পারেন।

তৃতীয়তঃ মাশরুম চাষের জন্য, তাপমাত্রার ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। তবে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ অয়েস্টার মাশরুম চাষের জন্য উপযুক্ত বলে মনে করা হয়। সময় যদি আপনারা ঠিক রাখেন তাহলে কিন্তু মাশরুমের ফলনও খুবই ভালো হবে।

Back to top button