বিখ্যাত বাঙালি গায়ক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের অন্তিম যাত্রায় হাজির ছিলেন বহু মহান ব্যক্তিত্ব, জানেন সেদিন কি বলেছিলেন তাঁরা? দেখুন ভিডিও

নিজস্ব প্রতিবেদন: তার জন্ম শতবর্ষ পার হয়ে গিয়েছে বছর দুয়েক আগেই ।কিন্তু বাংলা আধুনিক গান, প্লে-ব্যাক, বাংলা-হিন্দি গানে সুরারোপের কথা বললে সবথেকে প্রাসঙ্গিক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, আজও। নামে হেমন্ত, কিন্তু কণ্ঠে চিরবসন্ত। তাছাড়াও সঙ্গীত পরিচালক হিসাবে ভারতীয় সঙ্গীতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা জেনে নেব হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের অন্তিম যাত্রার কিছু কথা। কিভাবে সম্পন্ন হয়েছিল তার অন্তিম যাত্রা? মহান ব্যক্তিত্বরা এসে কি বলেছিলেন সেদিন!

সম্প্রতি এই বিষয়ে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়ে উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়ায় যা দেখার পর রীতিমতো আপ্লুত হয়ে উঠেছেন নেটিজেনরা। এই ভিডিও থেকেই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জীবনের কিছু অজানা কথা আমরা আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চলেছি। চলুন আর দেরি না করে আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনটি শুরু করা যাক।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গে সুভাষ মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, “আমাদের বন্ধুত্ব কৈশোরের। একসঙ্গে আমরা স্কুলে পড়েছি। আমাদের যে ভাব গড়ে উঠেছিল সেটা প্রধানত লেখার সূত্রেই। হেমন্ত তখন গল্প লিখতো। ওখানে একটা লাইব্রেরী ছিল কল্যান সংঘ বলে, হেমন্ত ছিল ওখানকার সম্পাদক। একদিন আমরা স্কুলেই আবিষ্কার করি যে হেমন্তর গানের গলা ভীষণ ভালো। সেই সময় আমরা যারা হেমন্তর ঘনিষ্ঠ ছিলাম তারা ঠিক করি হেমন্তকে সাহিত্যে নিরুৎসাহ করে গানের দিকেই বেশি উৎসাহিত করব।

যদিও প্রথমদিকে হেমন্তর ব্যাপারটা ভালো লাগেনি। তবে আমরা যারা সঙ্গী সাথী ছিলাম সকলেই কিন্তু ওর ধাত ভালো বুঝেছিলাম। আজকে হেমন্ত আমাদের কিন্তু গর্ব। আমরা একসঙ্গে পড়েছি এই জন্য নয়। বাঙালি হিসেবে আমরা হেমন্তকে নিয়ে গর্ব করি। সারা ভারতবর্ষের মানুষ হেমন্তকে ভারতীয় বলে গর্ব করে। শুধুমাত্র গায়ক নয় ব্যক্তিগত জীবনেও হেমন্ত ছিল এক অসাধারণ মানুষ”।

অন্যদিকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে এক সাক্ষাৎকারে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন,“আজ থেকে বহু বছর আগে একটি গানে আমি হেমন্ত দার সঙ্গে প্লেব্যাক করি। কত জলসায় বা কত অনুষ্ঠানে আমি তার সঙ্গে কাটিয়েছি, তার হিসেব রাখতে গেলে সবকিছুই হারিয়ে ফেলবো। হেমন্ত দার গান শৈলী এমনই ছিল যে তা বাংলা গানের ধারাকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল। তার উচ্চারণ ভঙ্গি বা থেকে শুরু করে অপূর্ব কণ্ঠ মাধুর্য কোনটারই কিন্তু তুলনা হয়না।

আর কোনদিন হবেও কিনা সেটা নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে। যতদিন বাংলা গান থাকবে ততদিন হেমন্ত দাও আমাদের মাঝে থাকবেন”। অন্যদিকে মান্না দের বক্তব্য ছিল,”হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ছিলেন আমার নিকট আত্মীয়ের মতন। এত সুন্দর গানের গলা নিয়ে কিন্তু খুব কমই লোক জন্মাতে পারেন”। পাশাপাশি হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রসঙ্গে মুখ খুলতে দেখা গিয়েছিল অসিত সেনকেও। তার কথায়,“ তিনি যা দিয়ে গিয়েছেন তা অনবদ্য। ভারতবর্ষে যাদেরকে এক নামে চেনেন সেই কয়েকজন মানুষের মধ্যে রয়েছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়”।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর মৃণাল সেন জানিয়েছেন,“ তার জীবনে বহু achievement ছিল। মানুষ হিসেবে আমি এটাই বলব যে এরকম ব্যক্তি আমি জীবনে দেখিনি। এত বড় মানুষ হয়েও তিনি জীবনের যে প্রতিটি ঘটনা মনে রেখেছেন সেটাই তো সব থেকে আশ্চর্যের”। অন্যদিকে অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তো হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কে জীবনের একটা অংশ বলেই উল্লেখ করে দিয়েছিলেন সেই সময়। অভিনেতা জানিয়েছেন তার গান শুনেই, আমরা বড় হয়েছি নিজেকে তৈরি করেছি। আমার কাছে বলার কোন ভাষা নেই যে কতটা কষ্ট হচ্ছে।

একটাই সুখের কথা যেহেতু তিনি সঙ্গীতশিল্পী তাই অনেক গান রেখে যাচ্ছেন আমাদের জন্য”। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ১৯৩৫ সালে প্রথম অল ইন্ডিয়া রেডিওর জন্য গান রেকর্ড করেন হেমন্ত। গানের প্রথম লাইন ছিল, ‘আমার গানেতে এলে নবরূপী চিরন্তনী’। এ সময় হেমন্তের শিক্ষাগুরুর ভূমিকা নিয়েছিলেন শৈলেশ দত্তগুপ্ত, তবে হেমন্ত নিজের গানের ধাঁচ তৈরি করেছিলেন প্রবাদপ্রতিম গায়ক পঙ্কজ মল্লিকের অনুকরণে।

হেমন্তের প্রথম হিন্দি গান ছিল ‘কিতনা দুখ ভুলায়া তুমনে’ এবং ‘ও প্রীত নিভানেওয়ালি’। এই গান দুটির সুর করেছিলেন কমল দাশগুপ্ত, কথা লিখেছিলেন ফৈয়াজ হাশমি।১৯৪১ সালে মুক্তি পাওয়া ছবি ‘নিমাই সন্ন্যাস’-এ হরিপ্রসন্ন দাসের সুরে প্রথমবার বাংলা ছবিতে গান করেন হেমন্ত। হিন্দিতে প্রথম ছবির গান ১৯৪৪ সালে, ‘ইরাদা’ ছবির জন্য, পণ্ডিত অমরনাথের সুরে।

সেই একই বছরে তিনি প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করেন, তাও ছায়াছবির জন্যই। ছবি ‘প্রিয় বান্ধবী’, গান ‘পথের শেষ কোথায়’।পঞ্চাশের দশকের শেষদিক থেকে শুরু হয় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কেরিয়ারে ক্রমাগত উত্থান। ছবির গান, আধুনিক, রবীন্দ্রসঙ্গীত, সর্বত্রই তাঁর জয়জয়কার, তা গায়ক হিসেবেই হোক বা সুরকার। এতরকম গায়কীর মধ্যে এই অনায়াস বিচরণ অত্যন্ত বিরল।

Back to top button