শেষ শ্যুটিং চলাকালীন আচমকা হৃদরোগে আক্রান্ত, এই সিনেমায় অভিনয় করতে করতেই পরলোক গমন করেন মহানায়ক উত্তম কুমার!

নিজস্ব প্রতিবেদন: মাত্র ৫৩ বছর বয়সের হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পরিবার-পরিজন আর অগণিত ভক্তদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমার। আজও বাঙালির মনে উত্তম কুমারের নাম শুনলে কিন্তু একপ্রকার আলাদা আবেগ কাজ করে বলা যায়। ৪২ বছর পরেও কিন্তু উত্তম কুমার মানুষের মনের গহীনে একই রকম ভাবে জায়গা দখল করে রয়েছেন। তার উপস্থিতি থেকে শুরু করে তার অভিনয়, তার আকর্ষণ সবকিছুই যেন আজও বাঙালির কাছে একেবারেই অমলিন।

এমন আকস্মিক ভাবে তিনি যে চলে যাবেন সেটা কিন্তু কেউ কল্পনা করতে পারেননি। অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যেই আড়াইশোটির বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন মহানায়ক। সবথেকে আশ্চর্যের ব্যাপার কি জানেন হার্ট অ্যাটাক হলেই কিন্তু কেউ ঝিমিয়ে পড়েন, কেউবা যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকেন। কিন্তু হার্ট অ্যাটাকের সময় উত্তম কুমার ক্যামেরার সামনে জীবনের শেষ শর্ট দিচ্ছিলেন। ২৩ শে জুলাই, ১৯৮০ সালে সেদিন চলছিল সলিল দত্ত পরিচালিত ওগো বধূ সুন্দরী ছবির শেষ দিনের শুটিং।

উত্তম কুমারের এই শেষ দিন প্রসঙ্গে বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন কথা বলা হয়। অনেকের মতে সেদিন অন্য দিনের তুলনায় একটু বেশি অন্যমনস্ক ছিলেন মহানায়ক। প্রাণপ্রিয় সুপ্রিয়া দেবী সেই সময় হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। পাশাপাশি মহানায়কের সাধের টেপ রেকর্ডারটিও চুরি হয়ে গিয়েছিল। সব মিলিয়ে সেদিন সকাল থেকেই মহানায়কের মন অত্যন্ত ভারাক্রান্ত অবস্থায় ছিল। তবে এতকিছুর পরেও চূড়ান্ত পেশাদারী ঢঙে ক্যামেরার সামনে অভিনয় করেছিলেন তিনি।

এই প্রসঙ্গে সম্প্রতি ওগো বধূ সুন্দরীর পরিচালক সলিল দত্তের একটি সাক্ষাৎকার সামনে এসেছে, যা তৎকালীন একটি ম্যাগাজিনে জানিয়েছিলেন তিনি। ছবির পরিচালক সলিল দত্ত উত্তম কুমার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে জানান, “ওগো বধূ সুন্দরীর সব ঘটনা চোখের ওপর ভাসছে। বিশেষ করে শেষ দুদিনের কথা । ২১ শে জুলাইয়ের প্রথম শট্ শেষ হলো । লাঞ্চ পর্যন্ত অনায়াসে বেশ কটি শট্ দিল উত্তম। ভীষন জলি মুড। লাঞ্চ ব্রেক হলো। ও কিন্ত খেলনা। বলল খেলে আর কাজ করা যায়না।

ঘন্টা খানেক পরে আবার কাজ শুরু হলো। বেশ কয়েকটা শট্ ভালভাবেই হয়ে গেল। হঠাৎ একটা শটের মধ্যে উত্তম কপালে হাত দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করল। দেখা গেল কপাল দিয়ে রক্ত পড়ছে। একটা জয়পুরী ছাইদানি ছুঁড়ে ফেলার দৃশ্যে সেটারই একটা টুকরো দরজায় লেগে ওর কপালে এসে লাগে। আমি শুটিং প্যাক আপ করে দিলাম। তখন বিকেল পাঁচটা। আমি ওকে নিয়ে ময়রা ষ্ট্রীটে ফিরে এলাম। ডাক্তার দেখলেন। ওষুধ দিয়ে গেলেন। উত্তম কিন্ত শুটিং বন্ধ রাখতে রাজি হলনা। বলল এরকম দু একটা ছোট বড় ঘটনা ঘটেই থাকে।

দেশপ্রেমীর শুটিংয়ের সময় টাইমিং- এর গন্ডগোল- এ আমি তো সজোরে অমিতাভর মাথায় লাঠির বাড়ি মেরে দিলাম। ওর মাথা নীচু করার কথা ছিল, কিন্ত করেনি। অমিতাভ যথারীতি শুটিংয় করল। এসব নিয়ে ভাববার কিছু নেই”। সাক্ষাৎকারের পরবর্তী অংশে সলিল দত্ত বলেন, “তেইশে জুলাই বুধবার। এগারটা পনেরোয় উত্তম টেকনিসিয়ান ষ্টুডিওয় এল। আমি তখন লাইটম্যানদের বললাম ছোট ছোট জোনে আলোর ব্যবস্থা করতে। এত বড় সিঁড়ি দিয়ে উত্তম বার বার ওঠানামা করলে ওঁর কষ্ট হবে।

উত্তম বলল না না ওভাবে মুড আসেনা। অনেক খানি জায়গা না পেলে মুভমেন্টের অসুবিধা হয়। বাধ্য হয়েই বড় জোনের ব্যবস্থা হল । শেষ হলো ওঁর জীবনের শেষ শট্ উচ্চারিত হল শেষ সংলাপ। যদিও কোনো একজন লক্ষ করেছেন এরই মধ্যে উত্তম একসময় ট্যাবলেট খেয়েছে আর বুকের বাঁ দিকটায় হাত দিচ্ছিল। বুধবারের কাজ শেষ হল। শেষ হল ওই সেটের কাজ। তখনও পর্যন্ত কেউ জানেনা, এই তাঁর শেষ অভিনয়। এমনকি উত্তমও না”।

২৩ শে জুলাই ওগো বধূ সুন্দরী ছবির শেষ দিনের পর মাত্র একদিনের মধ্যেই সবকিছু শেষ হয়ে যায়। ২৪ জুলাই মধ্য কলকাতার বেসরকারি হাসপাতাল থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে অবস্থিত ময়রা স্টেট এর বাড়িতে আর ফেরা হয়নি সকলের প্রিয় মহানায়কের। নিজের ব্যক্তিগত জীবনে বহুবার অনেক কিছু নিয়েই চর্চার বিষয় বস্তু হয়ে উঠেছিলেন মহানায়ক। কোন কিছুই কিন্তু তার অভিনয় জীবনে প্রভাব ফেলতে পারেনি।

সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তার জুটি ছিল অবিচ্ছেদ্য জুটি। এছাড়াও সমকালীন বহু জনপ্রিয় অভিনেত্রীদের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। জীবনের শেষ বিদায় কিন্তু তাকে দেখতে এসেছিলেন প্রায় কম বেশি সবাই।। সব থেকে আশ্চর্যের ব্যাপার কি জানেন উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই ধীরে ধীরে লোক চক্ষুর আড়ালে চলে যান সুচিত্রা সেন। এরপর আর কখনোই তাকে কিন্তু ক্যামেরার সামনে দেখা যায়নি।

Back to top button