স্বর্ণযুগের বিখ্যাত অভিনেত্রী ছায়া দেবী, একাকিত্বের মধ্যে কেটেছে শেষ জীবন!

নিজস্ব প্রতিবেদন :- স্বর্ণযুগের একজন জনপ্রিয় বাঙালি অভিনেত্রী হলেন ছায়া দেবী। অভিনেত্রী ছায়া দেবী মানেই কপাল জুড়ে একটি বড় লাল বা খয়েরি রঙের গোল টিপ। মেহেন্দি করা লাল চুলের খোপা, নাক থেকে ঠিকরে পড়া নাকছাবির ঝলক আর বাহারি বটুয়া। দীর্ঘ ছয় দশক ধরে বাংলা সিনেমায় দাপিয়ে কাজ করেছেন এই অভিনেত্রী। তিনি যখন অভিনয় জগতে আসেন তখন সবে মাত্র বাংলা ছবি কথা বলতে শিখেছে। সবাক চলচ্চিত্রের সেই প্রথম যুগে তখন ভদ্র ঘরের মেয়েদের সিনেমায় কাজ করা নিয়ে নানান ধরনের কথা শুনতে হতো, তখন সেই সময় এক উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে ছায়া দেবী, অভিনয়ে এলেন খানিকটা বাড়ির লোকের উৎসাহ পেয়েই।

আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা জেনে নেব স্বর্ণযুগের জনপ্রিয় অভিনেত্রী ছায়া দেবীর জীবনের কিছু অজানা কথা। ১৯১৪ সালের ৩ রা জুন, ভাগলপুরে জন্মগ্রহণ করেন ছায়া দেবী। তার ভালো নাম কনকবালা গাঙ্গুলী। বাবার নাম ছিল হারাধন গাঙ্গুলী। ছোট থেকেই লেখাপড়া শিখতে শুরু করেছিলেন তিনি। তবে তৎকালীন বাল্যবিবাহ প্রথা, তার জীবনের ধারাবাহিকতাকেই বদলে দিল। মাত্র ১১ বছর বয়সে রাঁচির অধ্যাপক ভূদেব চট্টোপাধ্যায় এর সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায় তার। তবে কখনোই কিন্তু তার সংসার করা হয়ে ওঠেনি। জানা গিয়েছিল স্বামী ভূদেবের সংসারে মন ছিল না। তাই শেষ পর্যন্ত স্বামীর ঘর ত্যাগ করে বাপের বাড়িতে চলে এলেন কনক। কিন্তু তিনি ভেঙ্গে পড়েন নি।

ভাগলপুরের মোক্ষদা গার্লস স্কুলে পড়তে লাগলেন। এরপর ভাগলপুর ছেড়ে বাবার বদলির চাকরির জন্য তিনি দিল্লি চলে গেলেন। সেখানে গিয়েও বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে লেখাপড়ার মধ্যেই জীবন কাটাতে থাকেন তিনি। এই সময় কিন্তু তিনি গানও শিখেছিলেন। তার বাবা যখন বদলি হয়ে কলকাতায় এলেন তখন মান্না দের কাকা প্রবাদপ্রতিম শিল্পী কৃষ্ণচন্দ্র দের সান্নিধ্যে সংগীত চর্চা করতে লাগলেন কনক। এই সময় দুই পিসতুতো দাদার সাথ পেয়েছিলেন তিনি। দুজনেই কিন্তু থিয়েটার নিয়ে মেতে থাকতেন। এতদিন পর বোনকে কাছে পেয়ে দুই দাদাই বুঝলেন বিয়ের পর সংসার না করার ব্যথা কনকের মনে এক শূন্যতার সৃষ্টি করেছে।

আর এই শূন্যতা ভরাট করতে গেলে কনককে আরো বেশি করে ব্যস্ত করে তুলতে হবে। তার পিসতুতো দাদার এক বন্ধু তখনকার সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ম্যানেজার ছিলেন। তার সূত্রেই খবর পেয়ে পথের শেষে ছবিতে অভিনয়ের জন্য বোনকে পাঠিয়ে দিলেন তারা। শেষ পর্যন্ত অনেক চেষ্টার পর মুক্তি পায় এই ছবি। এই “পথের শেষে” ছবি দিয়েই ইন্ডাস্ট্রিতে পথ চলা শুরু হলো ছায়া দেবী। এই ছবিতে ছায়া দেবের অভিনয় ভালো লাগলো দেবকি কুমার বসুর। তিনি তার ছবি সোনার সংসারে ছায়া দেবীকে অভিনয়ের সুযোগ দিলেন।

এই ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পরে অভিনয় জগতে ছায়া দেবীর মাটি আরো শক্ত হয়ে যায়। এরপর একে একে রজনী, ঘনা,প্রতিশোধ, বিদ্যাপতি ছবি দিয়ে অভিনেত্রীর যশ খ্যাতি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু এই সময় আচমকাই ছায়াছবির জগত ছেড়ে ভাগলপুর এর উদ্দেশ্যে পাড়ি দিলেন ছায়া দেবী। এখানেই সংগীত চর্চায় মগ্ন হলেন। দামোদর মিশ্রের কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম নিতে থাকলেন তিনি। এইসময় দীর্ঘদিন রেডিওতে গান গেয়েছিলেন তিনি। তিনি চলচ্চিত্র জগৎকে ত্যাগ করলেও, চলচ্চিত্র জগৎ কিন্তু তাকে কখনোই ত্যাগ করতে পারেনি। পরিচালক সুশীল মজুমদারের একান্ত অনুরোধে তাকে আবারও অভিনয় জগতে ফিরে আসতে হয়।

ফিরে এসে তিনি অভয়ের বিয়ে ছবিতে অভিনয় করেন। তারপর একে একে দাদা ঠাকুর, রাজা রামমোহন, আরোগ্য নিকেতন, আপনজন, রাজকুমারী, সপ্তপদী, নির্জন সৈকতে, উত্তর ফাল্গুনী প্রভৃতি ছবিতে তাকে দেখা যায়। ছায়া দেবীর অভিনয় করা বাংলা ছায়াছবির সংখ্যা প্রায় ১০০টিরও বেশি।

নায়িকা থেকে শুরু করে পার্শ্বচরিত্র, মায়ের চরিত্রে বরাবর থেকেই তার অভিনয় অত্যন্ত পছন্দ হয়েছে দর্শকদের। তার মতন বহুমুখী প্রতিভা কিন্তু খুব কম অভিনেত্রীর মধ্যেই রয়েছে। ছায়া দেবীর হাত ধরে বাংলা ছবি এক অন্য মাত্রায় পৌঁছে গিয়েছিল বলা যায়। ২০০১ সালের ২৬শে এপ্রিল সেরিব্রাল অ্যাটাকে প্রয়াত হন ছায়া দেবী।

Back to top button